
গোলামী চুক্তির আড়ালে কি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্র চলছে?
দেশের সার্বভৌমত্ব কি ঝুঁকির মুখে? ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (ART)’ বা গোলামী চুক্তির ময়নাতদন্ত
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচিত “এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (ART)” নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তির শর্তাবলি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। একে 'গোলামী চুক্তি' হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে বাতিলের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
১. রাজস্ব আদায়ে ধস ও অসম শুল্ক সুবিধা:
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য তাদের শুল্ক মাত্র ১% (২০% থেকে ১৯%) হ্রাস করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ প্রায় ৪,৫০০টি মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে ১০০% শুল্ক** তুলে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতে দেশের এনবিআর (NBR) তথা রাজস্ব আদায়ে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হবে, যা জাতীয় বাজেট প্রণয়নে বড় ধরণের সংকট ডেকে আনবে।
২. বিপন্ন স্থানীয় কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্প:
প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার (৪২,৯৫৬ কোটি টাকা) মূল্যের মার্কিন কৃষি পণ্য (মাংস, দুধ, সয়া) বিনা বাধায় দেশের বাজারে প্রবেশ করলে স্থানীয় খামারিরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। কম দামে মার্কিন ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্য বাজারে সয়লাব হলে দেশের ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাতে পারে।
:৩. পোশাক খাতের পরাধীনতা:
রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধার শর্ত হিসেবে মার্কিন তুলা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে একদেশ-নির্ভর করে তুলবে। সস্তায় অন্য দেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির পথ রুদ্ধ হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে।
৪. রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ ও বিলাসিতা:
দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থায় আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের (১,৮৪,০৯১ কোটি টাকা) জ্বালানি ও বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতিকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে এই বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করা রিজার্ভের ওপর চরম আঘাত হানবে।
৫. সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ
চুক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো নীতিগত বাধ্যবাধকতা। অন্য কোনো দেশের (যেমন চীন বা ভারত) সাথে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি করতে না পারার শর্ত বাংলাদেশের স্বাধীন বাণিজ্যিক নীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত। এটি বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের দাসে পরিণত করতে পারে।
৬. স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মান নিয়ন্ত্রণের অভাব:
দেশীয় ল্যাবে পরীক্ষার পরিবর্তে মার্কিন সার্টিফিকেটকে (US FDA) চূড়ান্ত স্বীকৃতি দেওয়ার শর্তটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এর ফলে হালাল-হারাম বা মানসম্মত পণ্যের বালাই না রেখেই অনেক পণ্য বাজারে ঢুকে পড়তে পারে, যা দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের শিল্প, কৃষি এবং সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি টেকসই হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে এই বৈষম্যমূলক চুক্তির ধারাগুলো পুনর্মূল্যায়ন অথবা এটি সম্পূর্ণ বাতিল করা এখন সময়ের দাবি।