সারাদেশ

লুটপাটের ‘ব্লু-প্রিন্ট’ ফাঁস: আড়াই হাজার কোটি টাকার ‘মহালুট’: পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পালালেন ফয়েজ

  নিজস্ব প্রতিবেদক : 15 February 2026 , 2:32:42 প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার আইসিটি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) একটি প্রকল্পের নামে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাটের ছক কষার অভিযোগ ওঠার পরপরই তিনি জার্মানি পাড়ি জমালেন।

আজ শনিবার সকালে তিনি দেশত্যাগ করেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিটিসিএলের আধুনিকায়নের নামে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি অপ্রয়োজনীয় ও অতিমূল্যায়িত এই প্রকল্প তৈরি করেন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়া। তদন্ত শুরুর আগেই বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তিনি দেশ ছাড়লেন।

২৩০০ কোটি টাকার ‘ভূতুড়ে’ প্রকল্প

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিটিসিএলের আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে ব্যয়ের হিসাব কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। একে ‘পুকুরচুরি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তথাকথিত এই উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে জনগণের করের টাকা লোপাটের যে ছক কষা হয়েছিল, তার বিস্তারিত চিত্র নিচে তুলে ধরা হল

যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৩ গুণ বেশি দাম

প্রকল্পের সিংহভাগ ব্যয় ধরা হয়েছিল যন্ত্রপাতি কেনাকাটায়। জিপিওন (GPON) প্রযুক্তি ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ব্যয় প্রস্তাব করা হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অথচ বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসব যন্ত্রপাতির প্রকৃত বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি টাকা।

বিটিসিএল সূত্র বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দাম দেখিয়ে ভাউচার তৈরির পরিকল্পনা ছিল। মূলত চীন বা অন্য কোনো দেশ থেকে পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এনে বাকি প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করাই ছিল এই অতিমূল্যায়নের লক্ষ্য।

মাটির নিচের কাজে লুটপাটের আয়োজন
প্রকল্পে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, যেসব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিটিসিএল বা বেসরকারি এনটিটিএন (NTTN) অপারেটরদের লাইন ইতিমধ্যে বিদ্যমান, সেখানেও নতুন করে লাইন টানার কথা বলা হয়েছে। একে ‘ডুপ্লিকেশন’ বা দ্বৈত কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রকৌশলীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিটিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মাটি কাটা ও সিভিল ওয়ার্কের অডিট করা বেশ জটিল। তাই কাজ না করেই ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে এই টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল।’

সফটওয়্যার ও পরামর্শক বাণিজ্য
যন্ত্রপাতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সফটওয়্যার এবং ৫ বছরের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির (এএমসি) নামে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ না করেই পছন্দের আইটি কোম্পানিকে দিয়ে এই টাকা বের করে নেওয়ার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রকল্প তদারকির নামে পরামর্শক নিয়োগ খাতে রাখা হয় আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকা, যা মূলত নিজেদের লোকজনকে বেতন বা ফি হিসেবে দেওয়ার জন্য বরাদ্দ ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রকৃত বাজারমূল্য ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকাই ‘কস্ট ইনফ্লেশন’ বা বাড়তি মূল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার দাপট

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তাঁর বিশেষ সহকারীর পদ ব্যবহার করে পরিকল্পনা কমিশন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) থেকে এই অযৌক্তিক প্রকল্পটি পাস করিয়ে নেওয়ার জন্য জোর তদবির চালিয়ে আসছিলেন।

নিজের দুর্নীতি ঢাকতে এবং সিন্ডিকেটকে রক্ষা করতে তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনকেও (দুদক) প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু ফয়েজ তৈয়্যব নন, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধেও মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’-এর ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত চলছে। ঘনিষ্ঠজনদের এই বেপরোয়া দুর্নীতি প্রমাণ করে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই লুটপাটের পরিকল্পনায় জড়িত ছিল।

২৩০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি পাস হলে তা হতো দেশের আইসিটি খাতের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। তবে শেষ মুহূর্তে বিষয়টি জানাজানি হওয়ায় এবং পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব দেশত্যাগের পথ বেছে নিলেন।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আরও খবর

Sponsered content